অ-সাধারণ সুন্দর ও অন্যান্য গল্প
Ratan Lal Basu
Copyright 2011 Ratan Lal Basu
Smashwords Edition
Smashwords Edition, License Notes
Thank you for downloading this free ebook. Although this is a free book, it remains the copyrighted property of the author, and may not be reproduced, copied and distributed for commercial or non-commercial purposes. If you enjoyed this book, please encourage your friends to download their own copy at Smashwords.com, where they can also discover other works by this author. Thank you for your support.
Contents
সুন্ সান দুপুরে উমেশের সাথে ঝোপড়া আমগাছটার নিচে বসে মানসের কি ভালোই না লাগছিল। চাওয়াই নদীর উঁচু পাড়ে ঝুলন্ত ফুলঝাড়ুর ফুলগুলো মৃদু হাওয়ায় দুলছে, চারধারে বুনো ফুলের বাহার আর নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে চাওয়াই নদী। চরা পড়ে গেছে, জল এখন সামান্য, খুব জোর পায়ের পাতা ডোবে। নদীর ওপারে বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি অপদেবতার থান। নদীটা ইংরেজী এস অক্ষরের মত এঁকে বেঁকে মাঠঘাট, ধান ক্ষেত, বন বাদাড় পেরিয়ে বাংলা দেশের পচা গড়ের কাছে করতোয়া নদীতে মিশেছে। উত্তরে দূর বিসারী ধান ক্ষেতের সীমায় অরন্যের রেখা আর পশ্চাত্পটের পাহাড় চূড়োয় প্যাঁজা তুলোর মত একরাশ মেঘ কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ঢেকে দিয়েছে আর ছানাপোনা গুলো নীল আকাশে হুটোপুটি জুড়েছে; আমাদের রাজনীতিবিদ দের মত ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদল করছে, কখনও মহাকায় হাতী, কখনও লোমশ ভাল্লুক, কখনওবা পাখী আরও কতকি। কি একটা পোকা কট্ কট্ করে বিরামহীন ডেকে চলেছে আর একটা ছোট্ট সাদা-কালো পাখী ফুড়ুত্ ফুড়ুত্ করে এ ডাল থেকে ও ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। এমন নিশ্চুপ দুপুরের নির্জনতায় মন উদাস হয়ে যায় আর মনের মণিকোঠা থেকে উত্সারিত হতে থাকে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতির ঝলক আর মনে হয় সুখ-দুঃখ হাসি-কান্না ভরা জীবনটা কি সুন্দর।
মানস উমেশকে বলল, “আয়না, রাম লীলার পালাটা একবার হয়ে যাক”।
উমেশত এক কথায় রাজি। মানস রাম আর উমেশ লক্ষ্মণ। লক্ষ্মণের স্বভাব খারাপ। রোজ অভিনয়ের আগে রামের কাছ থেকে বিড়ি চেয়ে খাবে।
আজও বলল “মোক একটা বিড়ি দে ক্যানে”।১
রাম বলল “নিজের পয়সাত কিনি খা”।২
পালা শুরু হল। রাবন সীতাকে ধরে নিয়ে গেছে। রাম ব্যাকুল হয়ে লক্ষ্মণকে আবেদন জানাচ্ছে, “অক্ষ্মণ অক্ষ্মণ মোর সীতাক উদ্ধার করি দে।”৩
লক্ষ্মণ বলল, “পারিমোনা। অ্যালায় মোক কিতায়? মুই স্যালায় একটা বিড়ি চাছিনু দিছিলি?”৪
“আং সাং করেছিস কিতায়? একটা নোহায় মুই তোক এক মুঠা বিড়ি দি্মো। মোর সীতাক উদ্ধার করি দে ভাই।”৫
আর পারা গেলনা। দুজনে হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসি আর থামতেই চায়না।
II
এম.এ. পরীক্ষা শেষ হতেই মানস তার ছেলেবেলার স্কুলের শিক্ষকের পদ খালির বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত করে দিল। ওর বাবা দীর্ঘদিন জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকে উন্নয়ন আধিকারিকের কাজ করেছেন। বাবা বদলি হওয়ার পরও মানস পড়াশুনার জন্য উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত মার সাথে ভাড়া বাসায় থেকে গেল আর পরীক্ষা পাশ করে কলকাতার কলেজে ভর্ত্তি হওয়ার পর ভবানীপুরে নিজেদের বাড়িতে চলে এল। বাবাও ততদিনে ক্ষুদ্র শিল্প আধিকারিকের পদে উন্নীত হয়ে কলকাতায় চলে এসেছেন।
মানসের মত ছেলেকে পেয়ে স্কুল যেন হাতে চাঁদ পেল। হেডমাস্টার মশায় শুধু গম্ভীর ভাবে বললেন, “মানসের মত ছেলে কতদিন আর এখানে পড়ে থাকবে?”
অঙ্কের মাস্টার মশায় রসিকতা করে বললেন, “তোর অনেক সহপাঠী এখনো স্কুলকে ভালবেসে রয়ে গেছে। দেখবি ক্লাশের মধ্যে আবার নাম ধরে না ডাকে আর তুই বলে না ফেলে।”
মানস শিক্ষকদের আবাসনে জায়গা পেয়ে গেল আর একটা রান্না বান্নার লোকও পেয়ে গেল। ধীরেনের মা। আগে ওদের বাসায় অনেক দিন কাজ করেছে।
শহরের হই-হট্টগোল থেকে গ্রামের স্নিগ্ধ পরিবেশে এসে মানসের মনটা আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠল। সেই পুরোনো গাছপালা, নদী-নালা, ঘর-বাড়ি, মানুষজন, বন্ধু-বান্ধব। রোজ স্কুল শেষে ঘুরে ঘুরে সবার সাথে দেখা করে, কখনো ধান ক্ষেতের আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে চলে যায়, মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে নৈসর্গিক শোভা আর চোখ বুঁজে শোনে নদীর কুলুকুলু ধ্বনি। মনটা ভেসে যায় ছেলেবেলার দিনগুলোতে। স্মৃতির অতল গহ্বর থেকে হুড়মুড় করে ছুটে আসে হারানো দিনের ছেঁড়া ছেঁড়া গল্প-কথা। কী বিচিত্র এই জীবন, কোথায় এই অন্তহীন পথ চলার শেষ! গলা ছেড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতে থাকেঃ
“ওরে ভয় নাই, নাই স্নেহমোহবন্ধন,
ওরে আশা নাই, আশা শুধু মিছে ছলনা।
ওরে ভাষা নাই, নাই বৃথা বসে ক্রন্দন,
ওরে গৃহ নাই, নাই ফুলশেজরচনা।
আছে শুধু পাখা, আছে মহানভ-অঙ্গন
ঊষা-দিশা-হারা নিবিড়-তিমির-আঁকা–
ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।”৬
বুলু ঘোষের দোকানে উমেশের সাথে দেখা। জোর করে বেশ কয়েকটা চমচম খাইয়ে দিল।বুলুর পোড়াবাড়ীর চমচমের তুলনা নেই। কিন্তু এত কি খাওয়া যায়? মানস বলল, “আর পারবোনারে।”
ওদিক থেকে রোহিনি খুড়ো মন্তব্য করলেন, “খাইয়া ফালাও, তোমাগো বয়সে-----”
মানস ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “সেসব দিন আর নেই খুড়ো। শুনেছি আমার বয়সে আপনার চারটে বউ আর পাঁচটা রক্ষিতা ছিল আর আমিতো এখনো একটাও জুটাতে পারলামনা।“
খুড়ো গজগজ করতে করতে বললেন, “হঃ, পোলাপানগুলার মুখের আগল নাই।”
একসময় খুড়োর একটা ডাগোর-ডোগোর মদেশিয়া৭ ঝির সাথে লটর-পটর ছিল। ওর বউ মানসের মার কাছে কত কান্নাকাটি করতেন। দুষ্টু লোকে বলে ময়নার ছোট ছেলে বুধু ওরাওঁকে নাকি অনেকটা খুড়োর মত দেখতে।
উমেশ ভারতীয় বিমান বাহিনীতে চাকরি করে হায়দ্রাবাদে, কয়েক দিনের ছুটিতে বাড়ী এসেছে। ঠিক হল রবিবার বিকেলের দিকে মানস ওদের বাড়ী যাবে।
III
সূর্যটা ঢুলু ঢুলু লালচে চোখে পশ্চিমের মেঘের তুলতুলে গদিতে ঢলে পড়ছে, আকাশ জুড়ে ক্ষুদে মেঘেরা মাতোয়ারা হয়েছে আবির খেলায় আর মাঝে মাঝে উত্তরের মেঘের আড়াল থেকে কাঞ্চন জঙ্ঘার চূড়োগুলো উঁকিঝুঁকি মারছে আর দুষ্টু মেঘেদের রঙের খেলা দেখে ছেনাল মেয়েদের মত ফিক করে হেসে মেঘ পর্দায় মুখ লুকাচ্ছে। আর দেরী নয়। বসে বসে ঝিমুনি এসে গেছে। ঘুমিয়ে পড়লেই চিত্তির। ওরা ঝটপট উঠে পড়ে পা চালালো। খড়ের কুটির গুলোর সামনে আম-কাঁটালের গুঁড়িতে ঘুঁটের তাল, মন্দিরের চূড়োর মত পোয়াল পূঁজি আর মাচায় মাচায় দোল খাচ্ছে ঝিঙে, শশা, চিচিঙ্গে আর আকাশ জুড়ে সারিবদ্ধ পাখির ঝাঁক নীড়ে ফিরছে।
সামনেই পেত্নীর বিল, দুপাশে ঘন বাঁশ বন। গা ছম্ছম্ চাঁদনী রাতে এখানে বসে ওরা কত ভূতের গল্প করেছে, কত রকমের ভূত। চন্দনতো সেবার ভয়েই কেঁদে দিল।
উমেশদের অবস্থা এখন অনেক ভালো হয়েছে। পাকা দোতলা বাড়ী, উঠানে কয়েকটা গরু-মোষ জাবনা চিবোচ্ছে। উমেশের মা-বাবাতো মানসকে দেখে বেজায় খুশী। পূর্ণকাকু বললেন, “আরে মানসযে। হেডমাস্টার মশায়ের কাছে তুমি স্কুলে জয়েন করেছ শুনে খুব খুশী হয়েছি। বি.ডি.ও. সাহেব আর তোমার মা ভালো আছেন? কলকাতায় এতদিন থেকে এখানে মন টিকবেতো?”
উমেশের মা মানসকে দেখে বললেন, “তোক কনেক শুখা নাগিছে, কলকেতার জল-হাওয়া ভালো নোহায়।”৮
পাশের ঘর থেকে উমেশের ঠাকুমা বলে উঠলেন, “কায় আসিছে?”৯
নব্বইয়ের উপর বয়স, হাঁটাচলা করতে পারেন না, কানেও কম শোনেন, তবু সব কিছুতে নাক গলানো চাই।
উমেশের মা রাগত স্বরে বললেন, “বুড়িডা দিন রাত ভ্যাদর ভ্যাদর করি গালি পাড়ে, মোর হইছে জ্বালা।”১০
মানস চা খাচ্ছে এমন সময় গট মট করে ঘরে ঢুকে একটা মেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, “আরে মানসদা!” মানস মুখ তুলেই চমকে উঠল, একাদশ শ্রেণীর সেই দুষ্টু মেয়েটা। ওর অবাক চাহনি দেখে মেয়েটা খিল খিল করে হেসে উঠলো, “কে আন্দাজ করুনতো।”
“কে আবার, ফুচকি, উমেশের বোন।”
“সেদিনতো চিনতেই পারলেন না।”
“চিনব কি করে? কত বড় হয়ে গেছ আর তোমার ভাল নামটাও কি ছাই জানতাম।”
“জানতেননা মানে? ছোটবেলায় আমাকে খ্যাপানোর জন্য গান করতেন, ‘ভালো কইরা বাজাও দোতারা সুন্দরী কমলা নাচে’। এর মধ্যেই সব ভুলে বসেছেন?”
“ক্লাশে বদমাইশী করছিলে কেন?”
“বারে, বদমাইশী কি করলাম? আপনাকে দেখে একটু হাসি পেয়েছিল আর আপনি সবার সামনে ক্লাশ থেকে বের করে দিলেন?”
“ফের ক্লাশে হাসলে কান ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে দেব।”
“ঈশ্!”
কমলাকে দেখতে কি সুন্দর হয়েছে। গোল মোঙ্গলীয় ধাঁচের মুখ, চাপা নাক, মাথায় একরাশ ঘন কালো চুল, দুষ্টুমী ভরা গভীর কালো চোখ, কপালে টিপ আর কচি কলাপাতা রঙের শাড়ীতে যা মানিয়েছে।
পোশাক বদলে কমলা গল্প জুড়ল। মানস ওকে আতামিয়ার গাছ থেকে কাঁচামিঠে আম পেড়ে দিয়েছিল, ডাক্তার পাড়ায় ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে কাঁধে করে নদী পার করে দিয়েছিল, চুলে হাগড়া কাঁটা দেওয়ায় ও খুব কেঁদেছিল। এতসব কথা মনে রাখে কি করে?
কমলা গম্ভীর হয়ে বলল, “আমার অঙ্ক আর ইংরেজীতে অসুবিধা হচ্ছে। আমরা চারপাঁচ জন ছেলেমেয়ে ঠিক করে ফেলেছি আপনার কাছে প্রাইভেটে পড়ব।”
“আমাকে না জানিয়েই সব ঠিক হয়ে গেল?”
“কেন আপনার অসুবিধা আছে নাকি?”
“না তেমন কিছু না, তবে পয়সা নিয়ে পড়াতে পারবোনা।”
“সেটা কি করে হয়?”
“তোমার বন্ধুদের বলে দিও বিনে পয়সায় পড়লে পড়বে না হলে না। আমার এক কথা।”
সন্ধ্যা নেমেছে। মাঠেঘাটে ঝরে পড়ছে মোহময়ী জোছ্না। মানস বলল, “চলনা উমেশ বিলের ধারে বসে ভূতের গল্প করি।”
কমলা বলে উঠল, “খবরদার ওখানে বসবেননা, ডলি শাকচুন্নী আছে।”
“সেটা আবার কে?”
“দুধকুমারের বোনকে অপদেবতায় মেরেছিল। এখন শাকচুন্নী হয়ে বিলের ধারের শ্যাওড়া গাছে থাকে।”
“ডলি কি আমার ঘাড় মটকাবে?”
“না, ধরে বিয়ে করে নেবে। এত্ত বড় বড় দাঁত, মাথায় জটা, হাতে বড় বড় নখ। বুঝবেন মজা।”
কমলা খিল খিল করে হাসতে লাগল। ওর মা বলে উঠলেন,”এ-হেঃ, মাইডা কেনং, মাষ্টারের সাথ এইনং করি আও গাড়ে?”১১
ওর বাবা বললেন “কালের হাওয়া!”
কমলা রেগে মেগে বলল, “তোমরা চুপ করত।”
উমেশ বলল, “ডলির ব্যাপারটা কিন্ত সত্যি। ছাগল চরাতে নদীর ধারে গিয়ে বাড়ী ফিরছিল না। খুঁজতে খুঁজতে ওর মৃতদেহ নদীতে পাওয়া গেল। সারাদেহে ফুটো আর একফোঁটা রক্ত নেই। তবে পেত্নী বা শাকচুন্নী হয়েছে কিনা জানিনা।”
“শাকচুন্নী আর পেত্নীর পার্থক্য কি?”
কমলা বলল, “এ মা তাও জানেননা। ভূতের আইবুড়ো মেয়েদের শাকচুন্নী বলে আর বউদের পেত্নী।”
“তারমানে তুমি হলে শাকচুন্নী।”
“খুব খারাপ হবে কিন্তু।”
মানস স্কুলের পর সপ্তাহে দুদিন ওদের পড়ায়। কমলার বুদ্ধিমত্তা দেখে অবাক হয়ে যায়। অল্প সময়ের মধ্যে বেশ ভাল ইংরেজী লিখতে শিখে গেল আর একটু বুঝিয়ে দিলেই অংকও সব চটপট করে ফেলে। মাইনে নিয়ে পড়ায়না বলে ওরা মানসকে বাড়ীর তরিতরকারী ফলমূল ভেট দিয়ে যায় আর আখেরে লাভ হয় ধীরেনের মায়ের। এসব মানস ওকেই দিয়ে দেয়। ওর দুই ছেলে ধীরেন আর বীরেন খেতেও পারে বটে। সেদিন তূহীন একটা বড় কাঁটাল দিয়েছিল। দুই ভাই পুরো কাঁটালটা সাপটে দিল। এইতো পাটকাঠির মত চেহারা, পেটে অত ধরে কি করে?”
পূজো এসে গেল। গাঢ় নীল আকাশে ক্ষুদে ক্ষুদে সাদা মেঘের খুন্সুটি, মাঠে মাঠে কাশফুলের সমারোহ, স্নিগ্ধ ভোরে কচু পাতায় শিশির বিন্দুর রূপোলি ঝিলিক, স্থল পদ্মের গোলাপী মাদকতা আর প্রাণকাড়া শিউলির সুবাস; নদীর ধারে ঊষা-ভূষার পূজোর প্যান্ডেল বাঁধা শুরু হয়ে গেছে, শিবু পালের কারখানার সামনে ঠাকুর গড়ার কাজ দেখতে এক দঙ্গল ছেলেমেয়ের ভীড়, চরাচর জুড়ে একটা খুশীর আমেজ।
পূজোর বন্ধে মানস কলকাতা ফিরে এল । গ্রামের পূজো দেখার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু মা বার বার করে বাড়ী ফিরে আসতে লিখেছেন তাই অনিচ্ছা সত্বেও মানসকে কলকাতা ফিরতে হল। গ্রাম থেকে ফিরে এসে কলকাতাকে আবার নতুন আর রোমাঞ্ছকর মনে হল। রাতভোর গাড়ি করে ঠাকুরও দেখা হল অনেক। ভাই ফোঁটার পর আবার স্কুল খুলল। এসে গেল উচ্চ মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষা।
টেস্ট পরীক্ষার পর পড়ার চাপ বেড়ে গেল। মানস এখন ওদের সপ্তাহে ছদিন করে পড়ায়। কমলা ভীষণ গম্ভীর আর সিরিয়াস হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে কেমন আনমনা হয়ে যায় আর মানসের দিকে কেমন করে চেয়ে থাকে, যেন কি বলতে চায়। মানস ভাবে ও কি বড় পরীক্ষার সামনে এসে ভয় পাচ্ছে আর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে? সবার বিশ্বাস ও খুব ভাল ফল করবে। যে করেই হোক ওর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।
একদিন ধীরেনের মা বলল, “তোমাক একডা কেথা বলিবার নাগে। ফুচকিডাক কেনং নাগেছে। সাবধান থাকিবেন।”১২
“ও তো একটা বাচ্চা মেয়ে।”
“বাচ্চা কোঠে, মাইডা অ্যালায় গাবুর হইছে। তোমায় হইলেন গিয়া অফিসরের ছোওয়া আর ওডাতো চাষার বেটী।”১৩
মানস বিরক্ত হয়ে বলল, “এসব কথা বলছ কেন, কমলা কি তোমার পাকা ধানে মই দিয়েছে?”
ধীরেনের মা গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে গেল। বাইরে গিয়ে ছড়া কাটল, “পিরীতির ফান্দে পড়ি, আজা ছোটে চাঁড়াল বাড়ী।”১৪
ওর স্পর্ধা দেখে মানস অবাক হয়ে গেল। মা একসময় আস্কারা দিয়ে ওকে মাথায় তুলেছেন। অন্য রাঁধূনীর খোঁজ করে ওকে তাড়াতাড়ি বিদেয় করতে হবে।
মানস ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু কমলার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা খুব ভালো হল। পরীক্ষার পর ও নীলফমারীতে মামার বাড়ী বেড়াতে গেল। ওখানে মামার অনেক জমিজমা। বাংলাদেশ মুক্তি যুদ্ধের সময় সবাই চলে আসতে বলেছিল, কিন্তু উনি ওসব ছেড়ে ভিখিরির মতো এদেশে আসতে চাননি। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন কলকাতায় আর ছেলে দুবাই-এ হোটেলে চাকরি করে। বুড়ো বুড়ী তবু নিজের ভিত ছেড়ে নড়বেননা। নীলফমারীতে হিন্দু মুসলমানে খুব মিলমিশ। হিন্দুরা ঈদ আর মহরমের উত্সবে যোগ দেয় আর মুসলমানরাও দুর্গা পূজো কালী পূজো্র আনন্দ উপভোগ করে। রাজবংশী মুসলমান মেয়ে আমিনার সাথে কমলার বেশ ভাব জমে গেল। সময় তরতর করে বয়ে যায় মাঠে ঘাটে ঘুরে আর নদীতে সাঁতার কেটে। তবুও মাঝে মাঝে মন আন্চান্ করে। মানসদার কথা মনে পড়ে যায়। গুন গুন গান করেঃ
“থুইলাম রে মন পদ্ম পাতায় থুইলাম রে মন জলে
আর অঞ্চলে ঢাকিলাম রে মন তবু কেন জ্বলে।”১৫
আকাশবাণী কলকাতার খবরে বলল দু-এক দিনের মধ্যে পশ্চিম বঙ্গের উচ্চ মাধ্যমিকের ফল বেরোচ্ছে। কমলা তড়িঘড়ি বাড়ী ফিরে এল। দুদিন পরে রেজাল্ট বেরোল। স্কুলে নম্বর সহ নামের লিস্ট দিয়েছে। পরদিন মার্কশিট দেবে। কমলা নিজে যেতে সাহস পেলনা। ওর বাবা দেখে এসে জানালেন কমলা স্কুলের মধ্যে সবার চেয়ে বেশী নম্বর পেয়েছে। হাই ফার্স্ট ডিভিসন। অল্পের জন্য অঙ্কে লেটার পায়নি। পরদিন সকালে কমলা সাজতে বসল। খোঁপাটা সুন্দর করে বেঁধে একটা প্রজাপতি ক্লিপ গুঁজল, গাঢ় গোলাপী রঙের শাড়ী পরল আর কপালে পরল একটা বড় সবুজ টিপ। আয়নায় দেখে নিজেই চোখ ফেরাতে পারেনা।
স্কুলে যেতেই বন্ধুরা সব হৈ হৈ করে উঠল, “খাওয়াচ্ছিস কবে?” কমলা মার্কশিট নিয়ে সটান চলে গেল টিচার্স রুমে। মানস এককোণে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। কমলাকে দেখে হেসে বলল, “রেজাল্টতো তোমার ঠিকই হয়েছে, তবে অঙ্কের নম্বরটা কেন এত কম হল বুঝতে পারলামনা। সবইতো উত্তর করেছিলে। হয়তো কিছু ভুল করে থাকবে। যাক এখনতো আর ভেবে কোনো লাভ নেই। কি পড়বে ঠিক করলে?”
“এ ব্যাপারে কাল আপনার বাড়ী গিয়ে কথা বলব।”
“ঠিক আছে এখন সবাই মিলে মজা করে নাও।”
অনেকদিন পর মানসদাকে দেখে আর ওর গলার স্বর শুনে কমলার কি ভালোই না লাগল। দু একজন বাদে সবার রেজাল্ট ভালো হয়েছে। সবাই মিলে অনেক্ষণ ধরে খুব হৈ হুল্লোড় হল। শেষ বিকেলে বাড়ী ফেরার পথে দেখে মানস নদীর ধারে ঝোপঝাড়ের মাঝে পা ছড়িয়ে বসে কবিতা আবৃত্তি করে চলেছেঃ
“প্রভেদ জটিল, অবগুণ্ঠিত সড়কে চাঁদের আলো
তাকে দিয়ো অই ফুলটি কারনেশন।
কতদিন তার মুখও দেখিনি, চেনা পদপাত পিছল অলক কালো,
ও-ফুলের কথা ব’লো না কাউকে বুড়া মালঞ্চ” ১৬
গনগনে লাল সূর্যটা গাছগাছালির আড়ালে ঢলে পড়েছে, এখনি ধেয়ে আসবে সন্ধ্যা। কমলার শরীর-মনে রোমাঞ্চ জাগে, দোনোমনা করতে থাকে, কাছে গেলে মানসদা যদি কিছু ভাবে। কিন্তু মন মানেনা। দুরুদুরু বক্ষে নদীর পাড় বেয়ে নীচে নামে। হঠাত কমলাকে দেখে মানস অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কবিতা থামিয়ে বলে, “বাড়ী চললে?”
কমলা কিছুটা সাহস পেয়ে হেসে বলে, “এখানে একা বসে কবিতা আবৃত্তি হচ্ছিল, বেশ লোকত আপনি। লোকে পাগল বলবে।”
মানস হেসে বলে, “তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। কবিতা আবৃত্তির এর চেয়ে ভালো জায়গা আর আর কোথায় পাব? দেখেছ রঙে রঙে আকশটা কেমন অপরূপ লাগছে?”
“আর কিছু দেখতে পাচ্ছেননা?”
মানসকে বোকার মত এদিক ওদিক তাকাতে দেখে কমলার ভীষণ রাগ হয় আবার হাসিও পায়।
অনেক ভেবে চিন্তে মানস উত্সাহের সাথে বলে, “ওঃ এবার দেখতে পেয়েছি।”
কমলার মনে রোমাঞ্চের পরশ লাগে। উদ্গ্রীব হয়ে বলে, “কি দেখলেন?”
“নীচে ঝোপের উপর সাদা-খয়েরি পাখীটার কথা বলছতো? তোমার চোখ আছেত। আমি এতক্ষণ খেয়ালই করিনি।”
কমলা বিরস ভাবে বলে, “ঠিকই বলেছেন। আমি এবার আসি। কাল তাহলে আপনার বাড়ী যাচ্ছি।”
আধো অন্ধকারে পথ চলতে চলতে কমলা রাগে ফুঁসতে থাকে। মুখ বিকৃত করে ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে বলতে থাকে, “তো-মা-র চো-খ আ-ছে-ত ......”
কানা কোথাকার। বুড়োহাবড়াগুলো পর্যন্ত হ্যাংলার মতো তাকিয়ে থাকে আর এ লোকটা এত কাছ থেকেও দেখতে পেলনা।
হঠাত্ কমলার মনটা খুশীতে ভরে ওঠে। কাকে সে কানা বলছে, সেত নিজেই এতদিন অন্ধ ছিল। যা অ-সাধারণ তাইত সুন্দর। ঝিঁঝিঁর ডাক আর জোনাকির ঝিকিমিকিতে মোহময় সন্ধ্যায় পথ চলতে চলতে কমলা সুন্দরের স্বপ্নে বিভোর হয়। পথপাশের খড়ের ঘরগুলোতে জ্বলে উঠছে টিমটিমে প্রদীপ। দূর থেকে ভেসে আসছে ভাওয়াইয়া গানের সুর। কল্পনার পাখায় ভর করে কমলা কখনো নিজেকে হারিয়ে ফেলে সন্ধ্যার রঙ্গীন আকাশের মাঝে। আবার কখনো সে সাদা-খয়েরি পাখী হয়ে পাড়ী জমায় অনির্দেশের পথে।
NOTES
১। আমাকে একটা বিড়ি দে তো।
২। নিজের পয়সায় কিনে খা।
৩। লক্ষ্মণ আমার সীতাকে উদ্ধার করে দাও।
৪। পারবোনা। এখন আমাকে কেন? আমি তখন একটা বিড়ি চেয়েছিলাম দিয়েছিলে?
৫। বেগড়বাই কেন করছ? একটা নয় আমি তোমাকে এক বান্ডিল বিড়ি দেব। আমার সীতাকে উদ্ধার করে দাও ভাই।
৬। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ কাব্য গ্রন্থের ‘দুঃসময়’ কবিতার শেষ পংক্তি – রবীন্দ্র রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৬; ১২৫তম রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ, ভাদ্র ১৩৯৪, বিশ্বভারতী প্রকাশনী, কলিকাতা।
৭। উত্তর বঙ্গের স্থানীয় লোকেরা ছোটনাগপুর ও উড়িষ্যা থেকে আগত চা শ্রমিকদের মদেশিয়া বলে। একসময় আড়কাঠিরা (labor contractor) ওদের প্রলোভন দেখিয়ে চা বাগানের কাজের জন্য নিয়ে আসে। এদের অধিকাংশই কুরুখ (ওরাওঁ, টির্কে, এক্কা, ভগত্ প্রভৃতি)। দু-এক জন মুন্ডা দেখা যায়। আমি কোন সাঁওতাল, হো বা সাতার দেখিনি। এরা বহু দেশ ঘুরে সাঁওতাল পরগণা অঞ্চলে এসেছিল বলে মুন্ডারী ভাষায় এদের ওরাওঁ বলা হয়। এদের আদী বাসস্থান জানা যায়নি। যেটুকু জানা যায় এরা বিহারের রোহতাসগড়ে বাস করত। তুর্কী আক্রমণ কারীরা এদের ওখান থেকে বিতাড়িত করার পর ওরা সাঁওতাল পরগণায় চলে আসে।
৮। তুমি অনেক রোগা হয়ে গেছ, কলকাতার জল বাতাস ভালো নয়।
৯। কে এসেছে?
১০। বুড়িটা দিনরাত কেবল বক বক করে আর গালাগালি দেয়। আমার হয়েছে যত জ্বালা।
১১। আরে মেয়েটা কিরকম, মাস্টার মশায়ের সাথে এভাবে কথা বলতে হয়?
১২। তোমাকে একটা কথা বলা দরকার। ফুচকিটাকে সুবিধার মনে হচ্ছেনা। সাবধান থাকবে।
১৩। বাচ্চা কোথায়, মেয়েটাতো এখন যুবতী হয়েছে। তুমি হলে সরকারী অফিসারের ছেলে আর ও তো কৃষকের মেয়ে।
১৪। প্রেমের ফাঁদে পড়লে রাজাও চন্ডালের বাড়িতে দৌড়য়।
১৫। আশা ভোঁশলের বিখ্যাত একটা গানের প্রথম দুই লাইন; গানটা ক্যাসেট, সি.ডি. ও ডিস্ক এ পাওয়া যায়।
১৬। ‘কারনেশন’ প্রথম পংক্তি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৭৭, পৃ-১৭
রাজবংশী ভাষা বাংলার-ই একটা উপভাষা (dialect); চাটগাঁ বা সিলেটের বাংলার তুলনায় অনেক সহজ বোধ্য। আমি গল্পে যে রাজবংশী ভাষা ব্যবহার করেছি তা পশ্চিম বঙ্গের জললপাইগুড়ি জেলা, দার্জিলিং জেলার সমতল এবং বাংলা দেশের পঁচাগড়, রংপুর ও নীলফমারী জেলায় ব্যবহৃত হয়। পশ্চিম বঙ্গের কুচবিহার, উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিন দিনাজপুর জেলায়, আসামের গোয়ালপাড়া জেলায়, বাংলা দেশের কুড়িগ্রাম, লালমণিরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগঞ্জ, নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলায় এবং নেপালের ঝাপা জেলায় ভিন্ন ভিন্ন sub-dialect ব্যবহৃত হয়, তবে পার্থক্য খুব সামান্যই।
‘ওই তো সেই গাছটা।’ রোগা প্রভু আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। মোটা প্রভুও দেখতে পেয়েছে। ওরা বাঁধের উঁচু পাড় থেকে নেমে গাছটার দিকে এগিয়ে চলল। সামনে ঝোপঝাড়, বিছুটি আর কাঁটাগাছও আছে; তাছাড়া সাপ-খোপও থাকতে পারে। ওরা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ঝোপগুলোকে নামিয়ে সাবধানে হেঁটে চলল আর বৃদ্ধ শাল গাছটার কাছে পৌঁছে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। ওইতো ফুট পাঁচেক উঁচুতে সেই সিঁদুরের দাগ, সিঁদুর তেলে গুলে দাগ কাটা হয়েছে যাতে জলে ধুয়ে না যায়। লাঠি দিয়ে লতার বেষ্টনি সরিয়ে গাছের গায়ে গভীর করে কাটা x চিহ্নগুলোও চোখে পড়ল। ঠিক গাছই তারা খুঁজে পেয়েছে। দুজনের মুখেই হাসি ফুটে উঠল।
‘তাহলে এবার আমাদের সোজা গিয়ে কুড়ি নম্বর গাছটার কাছ থেকে ডাইনে বাঁক নিতে হবে।’ রোগা প্রভু বলল।
‘দাঁড়া, ছকটা আবার একটু ভালো করে দেখেনি।’ মোটা প্রভু পকেট থেকে কাগজের টুকরোটা বের করে সাবধানে ভাঁজ খুলল। বহু পুরোনো কাগজ। রঙ চটে হলদেটে হয়ে গেছে। একটু অসাবধান হলে ছিঁড়ে যেতে পারে। দুজনে খুঁটিয়ে কাগজে আঁকা নকশাটা দেখল। তারপর লাঠি দিয়ে ঝোপ-ঝাড় সরিয়ে গাছ গুনে গুনে এগিয়ে চলল।
দুই প্রভুর নাম এক হলেও অনেক বিষয়েই অমিল। একজন মোটা, বেঁটে আর কালো; আর একজন রোগা, লম্বা আর ফরসা। মোটা প্রভু শান্ত স্বভাবের, চোখে-মুখে একটা বোকা-বোকা নিরীহ ভাব, মাথায় কদম ছাঁট চুল; রোগা প্রভু চটপটে, চোখে-মুখে ধূর্ত ভাব, চুলের ছাঁট অতি আধুনিক। দুজনের সবকিছু বিপরীত বললে ভুল হবে। মিলও আছে অনেক। দুজনের বয়স তিরিশের কাছাকাছি, বিহারের বাড়ি থেকে দুজনেই খুব ছোট বেলায় পালিয়ে এসেছে। হত দরিদ্র পরিবার, অজস্র ভাইবোন। ওরা বাড়ি ছাড়ায় বাবা মা খুশিই হয়েছে আর তাই ফেরানোর কোনো চেষ্টাও করেনি। ওরা আমবাড়ি ফালাকাটার কাছে একটা বস্তিতে একই ঘরে থাকে আর বন্ধুত্বও খুব গভীর। মোটা প্রভু বেসরকারি বাসে কন্ডাকটারি করে। রোগা প্রভু একটা দোকানে কাজ করে। দুজনের মাইনেই সামান্য। কোনক্রমে খাওয়া পরা চলে যায়।
দুই প্রভুই মানুষ হিসাবে বেশ ভালোই, বিড়ি ছাড়া আর কোনো বদ নেশা নেই। তবে রোগা প্রভুর একটা দোষ তাকে মাঝে মাঝেই সমস্যায় ফেলে। মেয়ে দেখলেই তার মন কেমন আনচান করে ওঠে আর অনেক সময় দুঃসাহসী এডভেঞ্চার করতে গিয়ে বিপদে পড়ে আবার উপস্থিত বুদ্ধির জোরে বিপদ থেকে বেরিয়েও আসে।
সেবার রোগা প্রভু একা জল্পেশের মেলায় বেড়াতে গিয়েছিল। অজস্র মানুষের ভিড়; অধিকাংশ লোকই চাটাই বা মাদুর পেতে মাঠের মাঝেই রাত কাটায়। সস্তার হোটেল থেকে রাতের খাওয়া শেষ করে প্রভুও একটা চাদর পেতে মৌজ করে বিড়ি ফুঁকছিল। হ্যারিকেনের আলোগুলো কমিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। চারিদিকে সুন-সান নির্জনতা। আধো আলোয় প্রভু দেখল একটু দূরেই চাটাই পেতে এক দম্পতি অঘোরে ঘুমোচ্ছে। বউটার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে, বেশ সাস্থ্যবতী। আরো অনেকের মতোই ওরাও উত্সবের খাতিরে ভাঙের গুলি খেয়েছে, তাই ঘুম সহজে ভাঙ্গার নয়। ওদের কাছাকাছি অন্য কোনো লোক নেই।
প্রভু আলতো করে প্রায় হামা দিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে গেল; হ্যারিকেনটা নিভিয়ে বউটার উপর চড়াও হল। বউটা তখনো নেশার ঘোরে; প্রভুকে ভাবল ওর স্বামী। বিরক্ত হয়ে ঘুম জড়িত স্বরে বলল,
‘এ-হেঃ, এইঠে এইলা করেছেন কিতায়? তোমায় মেলা-টেলা, মান্সি-টান্সি কোনো না বুঝেন। কালই না আতত কইলেন! তোমার তালডায় বেশি।’১
বউটার ক্রমাগত বকবকানিতে বরটার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমজড়িত কণ্ঠে বলল, ‘বক-বক করেছিস কিতায়, মুই কোঠে কি কন্নু?’২
প্রভু যথারীতি কাজ সেরে তার নিজের চাদরে সরে গেছে। বউটা বিস্রস্ত পোশাক ঠিক করতে করতে রাগত স্বরে বলল, ‘তোমায় কইলেন নাতো কায় কইল্?’৩
[১। ‘ও-হোঃ, এখানে এসব করছ কেন? তুমি মেলা-টেলা, মানুষ-টানুস কিচ্ছু বোঝনা। কাল রাতেই না ওসব করলে? তোমার কামনা বড় বেশি।’
২। ‘বকবক করছিস কেন, আমি কোথায় কী করলাম?’
৩। ‘তুমি করলে নাতো কে করল?’]
ওদিক থেকে প্রভু চিত্কার করে উঠল ‘কায় কইল্ কায় কইল্, ধরোরে ধরো।’
ওর চিত্কারে সব লোকের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ওরা ভাবল চোর এসেছে, তাই সমস্বরে চিত্কার জুড়ল ‘ধরোরে ধরো।’
রোগা প্রভুর এডভেঞ্চার এর কাহিনী শুনে মোটা প্রভু তো হেসেই বাঁচেনা। ঠাট্টা করে বলে ‘তাহলে তুই কিছুদিনের মধ্যেই বাবা হচ্ছিস’, তারপর গম্ভীর হয়ে বলে ‘এসব আর করতে যাসনা, ধরা পড়লে লোকে মেরে শেষ করে দেবে।’ রোগা তাচ্ছিল্যের সাথে বলল, ‘কিস্সু হবেনা, আমি ঠিক বেরিয়ে যাব।’ কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মোটার কথাই ফলে গেল। ফাঁকা মাঠে একটা স্কুলের ছাত্রীর সাথে বদমাইশী করতে গিয়ে রোগা প্রভু বেদম মার খেয়ে হাসপাতাল গেল। আর তারপর থেকে ওর এডভেঞ্চারের নেশাও ছুটে গেল।
বাসে সুন্দরী মেয়ে দেখলে মোটারও খুব ভালো লাগে আর অনেক সময় ওদের কাছ থেকে ভাড়ার পয়সা নিতে ভুলে যায়। আর চালু মেয়েগুলো তার লাজুক নিরীহ স্বভাবের সুযোগ নিয়ে বিনা ভাড়ায় বাস ভ্রমণ করে নেয়।
এক কন্ট্রাক্টরের কাছে রোগা মাটিকাটার একটা ভাল কাজ পেয়েছিল। কিন্তু এখানে রাস্তার কাজ শেষ হতেই লোকটা দিনাজপুরে নতুন কাজ নিল। রোগাকেও যেতে বলেছিল, কিন্তু ও আস্তানা আর বন্ধুকে ছেড়ে অতদূর যেতে রাজী হলনা, ফিরে এল আবার দোকানের কাজে।
বাসে এখন ইউনিয়নবাজি চলছে, রাজনীতি না করলে রোজ কাজ পাওয়া যায়না। দুই প্রভু রোজ রাত্রে বিড়ি টানতে টানতে দুঃখের কথা বলে। এভাবে আর চলেনা, একটা কিছু করতে হয়। কিন্তু ব্যবসা করতে গেলেও তো ক্যাপিটাল লাগে। কোথায় পাবে, কে ওদের ধার দেবে?
সুবর্ণ সুযোগ এসে গেল অযাচিত ভাবেই। অকৃতদার কৃপণ মহাজন তারাপদ সাহাকে রোগশয্যায় দেখার কেউ ছিলনা। দুই প্রভু খুব সেবা করল আর মরার আগে খুশি হয়ে সাহা তার লুকানো টাকার হদিস লেখা নকসাটা দিয়ে বলল, ‘সব টাকা তোমাদের, আমার জমানো টাকা ভোগ করার তো কেউ নেই। বাবারা, মরলে আমার মুখাগ্নিটা করে দিও আর পারলে গয়ায় একটা পিণ্ড দিয়ে এস।’
সাহার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার দিন সাতেক বাদে দুপুরের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে দুই প্রভু মলয়ের দোকান থেকে দুটো সাইকেল ভাড়া করে গুপ্তধনের সন্ধানে চলল। মোটার সেদিন বাসে কাজ নেই আর রোগা শরীর খারাপের অজুহাতে দোকান থেকে ছুটি নিয়েছে। ওরা সরস্বতীপুর হয়ে সোজা গজলডোবা তিস্তা ব্যারেজে গেল। ওখানে একটা চেনা বাড়িতে সাইকেল রেখে ব্রীজ পার হয়ে তিস্তা-মহানন্দা ক্যানেলের উঁচু বাঁধ ধরে এগিয়ে চলল ছক নির্দিষ্ট স্থানের দিকে।
কুড়ি নম্বর গাছটা পেরিয়ে এবার ডানদিকে সোজা করলা নদীর দিকে যেতে হবে। চারিদিকে পাখীর বিচিত্র কলকাকলি, বাঁদরের কিচির-মিচির, মন্দিরের ঘন্টার মত ঝিঁঝিঁ পোকার বিরামহীন ডাক। শালগাছের ঝাকড়া মাথাগুলো পরস্পরের দিকে ঝুঁকে পড়ায় সূর্যের আলো সম্পূর্ণ আড়াল পড়েছে, জায়গাটা বেশ অন্ধকার আর কেমন গা ছম্ছম্ করা পরিবেশ; গুপ্তধনের আদর্শ পরিবেশ বটে। ঝোপঝাড় সরিয়ে দুই প্রভু নির্ভয়ে এগিয়ে চলল।
‘ঐত ঝোরাটা।’ দুজনে একসাথে আনন্দে চিত্কার করে উঠল। তাহলে ওদের দুঃখের দিন এবার কাটতে চলেছে। অতগুলো টাকা পেলে অনেক কিছুই করা যাবে।
‘একটা মারুতি ভ্যান কিনলে কেমন হয়?’ মোটা বলল।
রোগা হেসে বলল, ‘ভাড়া বিশেষ পাবিনা; আজকাল এদিকে টুরিষ্ট কজন আসে বল, আর লোকাল চেনা লোকেদের ভাড়া দিলে পয়সা আদায় করতে পারবি না। তা ছাড়া খরচও আছে। তার চেয়ে বরং শিলিগুড়িতে একটা ইলেকট্রিকাল গুড্স এর দোকান দিলেই ভাল হবে।’
মোটা সায় দিয়ে বলল, ‘ঠিকই বলেছিস। ওসব জিনিসের আজকাল খুব ডিমান্ড আর লাভও প্রচুর।’
ঝোরাটা খাড়া নিচে নেমে গেছে আর তারপর একটা সমতল জায়গা যেটা বাঁক নিয়ে ঢালু হয়ে করলা নদীতে মিশেছে। বর্ষার এখন অনেক দেরি, ঝোরা খট্খটে শুকনো।
‘দেশলাই মোমবাতি বের কর, ভেতরে একদম অন্ধকার।’ রোগা বলল।
‘আমার কেমন ভয় করছে রে।’ মোটা কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল।
‘কিসের ভয়?’
‘সাহা কাকু যদি যক্ হয়ে টাকা পাহারা দেন?’
‘তাতে কি হয়েছে, উনি তো সব টাকাই আমাদের দান করে গেছেন আর আমাদের ভালোও বাসতেন নিজের ছেলের মত।’
দুজনে পাশের লতা ধরে সাবধানে ঢালু জায়গাটা থেকে নিচে নামল। সমতল জায়গাটায় তেমন জঙ্গল নেই, সম্ভবত সূর্যের আলো আসেনা বলে। মোটা প্রভু মোমবাতি ধরাল। এবার সেই ছোট সুড়ঙ্গটা খুঁজতে হবে। ঐত সামনেই ডানদিকে সুড়ঙ্গটা। বুকের ঢিপঢিপুনি নিয়ে ওরা দ্রুত সুড়ঙ্গের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু হায় এ-কি! সুড়ঙ্গের সামনে একটা ভাঙ্গা মরচে ধরা ট্রাঙ্ক পড়ে রয়েচে। কেউ আগেই ট্রাঙ্ক ভেঙ্গে সব টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েচে। ওরা চারিদিকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও আর কিছু পেলনা। ওরা গভীর হতাশা নিয়ে পা ছড়িয়ে মাটির উপর বসে পড়ল। ভাগ্য ফেরার এমন সুযোগ সামান্য ভুলের জন্য হাতছাড়া হয়ে গেল। কেন যে মরতে দেরি করতে গেল! কিন্তু এখন তো আর কিছুই করার নেই।
ওরা মোমবাতি নিভিয়ে অন্ধকারে নিশ্চুপ বসে রইল। অনেকক্ষণ বাদে রোগা প্রভু বলল, ‘চল ফিরে যাই। এখানে থেকে তো আর কোনো লাভ নেই, সন্ধ্যা হতেও বেশি দেরি নেই। আমাদের নতুন কিছু ভাবতে হবে।’
মোটা বিমর্ষ ভাবে বলল, ‘নতুন আর কি ভাবব? তুই ফিরে যা, আমি আর ফিরবনা।’
রোগা রাগত স্বরে বলল, ‘পাগলামী করিসনা।’
হঠাত্ নারী কণ্ঠের তীব্র আর্ত চিত্কারে ওরা ঝোরা থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল আর শব্দ লক্ষ্য করে ছুট লাগাল। কিছুটা এগোতেই দেখে এক স্বল্পবেশী ওতি-আধুনিকা তরুণী হাতে একটা খাবারের প্যাকেট নিয়ে পরিত্রাহি চিত্কার করে ছুটছে আর পিছনে কয়েকটা ধেড়ে বাঁদর তাড়া করেছে। ওরা লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যেতেই বাঁদরগুলো গাছের মগডালে উঠে পড়ল আর হাঁপাতে হাঁপাতে মেয়েটা বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’
মেয়েটার দিকে ভালো করে তাকাতেই দুজনেই চম্কে উঠল, ‘আরে এইত সেই টি.ভি তে দেখা “জঙ্গল বীরাঙ্গনা”। ব্রাজিলের ভয়ঙ্কর জঙ্গলে দারুণ দুঃসাহসিক সব কাজ করে সব প্রতিযোগী-প্রতিযোগিনীদের হারিয়ে “জঙ্গল বীরাঙ্গনা” উপাধি আর লক্ষ লক্ষ টাকা পেয়েছিল। পেপারে লিখেছিল মেয়েটা বাংলা তথা ভারতের গর্ব। ওরা টি.ভি. শো-তে ওর রোমহর্ষক কাণ্ড কারখানা দেখতে দেখতে আতঙ্কে অভিভূত হয়ে পড়ত। কিন্তু সে এখানে আসবে কি করে? রোগা প্রভু বিনীত স্বরে বলল, ‘ম্যাডাম, কিছু মনে করবেননা, আপনিই কি টি.ভি. তে দেখানো......’
মেয়েটা রোগার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ আমিই “জঙ্গল বীরাঙ্গনা” মীরা দাস। আজ কি বিপদেই না পড়েছিলাম, আপনারা না এসে পড়লে কি যে হত! আপনাদের ধন্যবাদ জানাবার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা। আপনারা এখন কোথায় যাবেন? বাঁধের উপর আমার গাড়ি আছে। চলুন আপনাদের পৌঁছে দি।’
‘গজল ডোবা ব্যারেজের কাছে আমাদের সাইকেল আছে। আমারা হেঁটেই যেতে পারব।’
‘না ওটুকু পথ আমার গাড়িতে চলুন। তাছাড়া আপনাদের সাথে কিছু কথা আছে।’
গজল ডোবায় গাড়ি থেকে নেমে ওরা সাইকেল নিয়ে এল। রোগা প্রভু ভদ্রমহিলাকে সপ্রতিভ ভাবে বলল, ‘এবার বলুন কি বলতে চান।’
বীরাঙ্গনা মিষ্টি হেসে বললেন, ‘আপনাদের নাম ঠিকানা দিন। আমি পুরষ্কারের চেক পাঠিয়ে দেব। এখনত চেকবই কাছে নেই।’
‘কিসের পুরষ্কার!’ রোগা বিষ্মিত হয়ে বলল।
‘কিসের আবার? আমার জীবন বাঁচানোর। আমি আপনাদের প্রত্যেকের নামে দু-লক্ষ টাকার চেক পাঠিয়ে দেব।’
‘দু-লক্ষ, এত টাকা!’ দুই প্রভুই বিষ্ময় মাখা স্বরে বলে উঠল।
‘এ-তো সামান্য টাকা। আমি প্রতিযোগিতা জিতে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা পেয়েছি, তা ছাড়া বিজ্ঞাপনে আরো অনেক। দু-লক্ষ না, আমি আপনাদের পাঁচ লক্ষ করে দেব। দিন আপনাদের নাম ঠিকানা।’
বীরাঙ্গনা ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে পেন আর একটা ছোট ডাইরী বার করে ওদের দিকে এগিয়ে ধরলেন।
রোগা প্রভু হেসে বলল, ‘আমরা পুরষ্কারের টাকা নিতে পারবনা।’
‘কেন?’
‘মানুষকে বিপদে সাহায্য করে টাকা নেওয়া মহা পাপ।’
মনে মনে বলল, ‘তোমার টাকা ছুঁলে আমরাও অপদার্থ টি.ভি.-র “বীর” হয়ে যাব।’
‘ঠিকই বলেছিস, আমরা টাকা নিতে পারবনা।’ মোটা প্রভুও সায় দিল।
ওরা সাইকেলে উঠে বাড়ির দিকে ছুট লাগাল আর বীরাঙ্গনা ওদের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকলেন। পথ চলতে চলতে মোটা প্রভু বলল, ‘আমরা অনেক ভালো আছি, কি বলিস?’ রোগা মাথা নেড়ে সায় দিল।
হায়ার সেকেণ্ডারী পাশ করেই দুর্দ্ধর্ষ সাঁতারু ব্রতীন বেরাকে কোলাঘাট ছেড়ে কলকাতা চলে আসতে হল। রেজাল্ট বেশ ভালোই ছিল। সহজেই জয়পুরিয়া কলেজে বি.কম. অনার্সে সুযোগ পেয়ে গেল। ওর বাবা ভোলানাথ বেরার নিমতলা ঘাটে কাঠগোলা, নূতন বাড়ি করেছেন আহিরীটোলায়। মেদিনীপুরের বাড়ি তালা বন্ধ করে ওর মাও চলে এলেন। ছোটবোন রীনা বেথুন স্কুলে ভর্ত্তি হওয়ার পর থেকে বাবার কাছেই থাকে। মা আর দাদাকে কাছে পেয়ে ওর আনন্দ আর ধরেনা।
ব্রতীনের মন কিন্তু বেশ খারাপ হয়ে গেল। বর্ষায় উন্মত্ত রূপনারায়ণ আর দামোদরে সাঁতার কাটতে কাটতে কত স্বপ্ন দেখেছে ইংলিশ চ্যানেল পার হবে। সব স্বপ্নকি এভাবে জলাঞ্জলি দিতে হবে? নাঃ, বি.কম. পাশ করেই আবার সাঁতারে নেমে পড়তে হবে। মাত্রত তিনটে বছর। দেখতে দেখতে তর তর করে কেটে যাবে।
পাড়ায় বন্ধু জুটল সুবীর, বিখ্যাত বৈষ্ণব দেব গোস্বামীর একমাত্র ছেলে। রোগা, ভীষণ ফর্সা, গোবেচারা ছেলেটা সহজেই ব্রতীনের মন কেড়ে নিল। মাথায় একরাশ উষ্ক খুষ্ক চুল আর কি মিষ্টি কথাবার্তা। হায়ার হেকেণ্ডারীতে স্ট্যাণ্ড করে দর্শনে অনার্স নিয়ে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্ত্তি হয়েছে অথচ একটুও অহঙ্কার নেই। ছেলেটার জ্ঞানও অসাধারণ। ব্রতীন মুগ্ধ হয়ে গেল ওর সাথে আলাপ করে আর অল্প সময়ের মধ্যেই দশাসই চেহারার ব্রতীন এই শীর্ণ ছেলেটাকে গুরু বলে মেনে নিল।
সুবীর রোজ ভোরে গঙ্গায় স্নান করে। ভীষণ ভক্তি ওর গঙ্গা দেবীর ওপর। গঙ্গায় রোজ পবিত্র মনে স্নান করলে নাকি সব রোগ আর সব পাপ মুক্ত হওয়া যায়। ব্রতীন জল দূষণের কথা তুলতেই সুবীর এক বিখ্যাত পরিবেশ বিদের লেখা দেখাল। তিনি লিখেছেন যে কলকাতার আশপাশে গঙ্গায় যে পরিমাণ দূষিত পদার্থ নিক্ষিপ্ত হয় তাতে গঙ্গার জল যে পরিমাণ দূষিত হওয়ার কথা ছিল, প্রকৃত দূষণ তার দশ শতাংশও নয়। এমনি মাহাত্ম গঙ্গা দেবীর।
একদিন সুবীর সলজ্জ ভাবে বলল, “ব্রতীন, আমার খুব ইচ্ছা করে গঙ্গা সাঁতরে পার হয়ে সালকিয়া যাই কিন্তু সাহস হয়না। তুমিত বড় সাঁতারু। আমার সাথে গঙ্গা পার হবে? তুমি পাশে থাকলে আমি ভরসা পাই।”
“তোমার মত বন্ধুকে সাহায্য করবনা এটা হতে পারে?”
এর পর থেকে রোজ ভোরে দুজনে গঙ্গা পারাপার করে। সুবীর ক্লান্ত হয়ে পড়লে চিত্ সাঁতার কাটে আর ব্রতীন পাশে থেকে সাহস যোগায়। ব্রতীনের বেশ ভালো লাগে। প্রিয় বন্ধুর মনে আনন্দ দেওয়া হচ্ছে আবার সাঁতারের অভ্যাসটাও বজায় থাকছে।
একদিন কথায় কথায় ব্রতীন বলল, “জান সুবীর আমি কত দুরন্ত নদীতে সাঁতার কেটেছি – বর্ষার দামোদর, রূপনারায়ণ, কেলেঘাই। এই ম্যাড়মেড়ে গঙ্গায় সাঁতার কেটে আর মন ভরেনা।”
সুবীর আতঙ্কিত হয়ে বলল, “ছিঃ, দেবী গঙ্গা সম্বন্ধে ওসব কথা বলতে নেই। আর জান, বানের সময় গঙ্গা কি ভয়ঙ্কর রূপ ধরেন? সেবারত একটা পুরো জেটি উড়ে গেল আর জেটির মোটা মোটা রেল গুলো বেঁকে চাকার মত হয়ে গেল।”
“তাহলেত এবার বানের সময় গঙ্গায় নাবতে হচ্ছে।”
“না-না, ওসব করতে যেওনা”, আতঙ্কিত হয়ে সুবীর বলল।
“আচ্ছা তুমি যখন বারণ করছ করবনা।”
সুবীরের ভয় কিছুতেই যায়না। ব্রতীনের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওর বাবা-মাকে সব জানাল। শুনেত ওর মা কেঁদে আকুল। দেব বাবু বললেন, “কেঁদনা। আমি ব্যবস্থা করছি।”
বন্ধু থানার ও.সি. কে ফোন করে বললেন, “মিহির বাবু, আমার ছেলেকে একটু থানায় ডেকে কড়কে দিনত।”
ও.সি. অবাক হয়ে বললেন, “আপনার ছেলে আবার কি করল? শুনেছিত খুব ভালো ছেলে।”
“আসলে ও পরিকল্পনা করছে বানের সময় গঙ্গায় সাঁতার কাটবে। শুনেত ওর মা কাঁদতে শুরু করেছে।”
“সর্বনাশ! পাগল নাকি? ঠিক আছে, আপনারা দুঃশ্চিন্তা করবেননা, আমি ব্যবস্থা করছি।”
পরের রবিবার সকালে ব্রতীনদের বাড়ী এক কনস্টেবল এসে হাজির। ব্রতীনের নাম ধরে ডাকতেই ওর ত প্রাণ খাঁচা ছাড়া। ছোটবেলা থেকেই ওর পুলিশে ভীষণ ভয়। কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “কেন আমাকে কি দরকার?”
পুলিশটা গম্ভীর স্বরে বলল, “আপনাকে আমার সাথে থানায় যেতে হবে, বড়বাবু ডেকেছেন।”
“কেন?” ব্রতীনের প্রায় কেঁদে ফেলার যোগাড়।
“সে আমি জানব কি করে? চলুন, না হলে ধরে নিয়ে যাব।”
ব্রতীনের বাবা বেরিয়ে এসে বললেন, “মিহির বাবু যখন ডেকেছেন যা না। হয়ত ওঁর ছেলে মেয়ে কাউকে প্রাইভেট পড়াতে হবে।“
বাবার কাছথেকে আশ্বাস পেয়ে ব্রতীন নির্ভয়ে থানায় চলল। মিহির বাবু ওকে বসতে বললেন। পড়াশুনা সম্বন্ধে দু একটা কথা জিজ্ঞাসা করার পর হঠাত্ বলে উঠলেন, “ইনফর্মারদের কাছে খবর পেয়েছি তুমি নাকি বানের সময় গঙ্গায় সাঁতার কাটার পরিকল্পনা করছ। মরতে চাও?”
ব্রতীনের বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটতে শুরু করেছে। ইনফর্মাররা ওদের কথা তাহলে শুনে ফেলেছে। কাঁদো কাঁদো গলায় ব্রতীন বলল, “মরব কেন, আমিত খুব ভাল সাঁতার কাটতে পারি। অনেক ......”
ওকে থামিয়ে দিয়ে ও.সি. বললেন, “জলে ডুবে না মরলে আমি তোমার ব্যবস্থা করব। মেরে আধমরা করে চোর ছ্যাঁচ্চড়দের সাথে গারদে পুরে দেব। এমনি সময় সাঁতার কাটতে পার। জোয়ার আর বানের সময় যেন তোমাকে গঙ্গার ধারে দেখা না যায়। ভাগো এবার।”
মিহির বাবু অনেক কষ্টে হাসি চেপে অন্য কাজে মন দিলেন। পুলিশের ভয়ে ব্রতীনের বানের গঙ্গায় সাঁতার কাটা আর হলনা।
দেখতে দেখতে সরস্বতী পূজো এসে গেল। পাড়ার মোড়ে মোড়ে, অলিতে গলিতে অজস্র পুজো। সুবীরদের ক্লাবেও বেশ বড়সড় একটা পুজো হচ্ছে। ব্রতীন ওদের পুজোয় অনেক সাহায্য করল। দুদিন বাদে আহিরীটোলা ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দিতে গেল টেম্পো করে। ঘাটে প্রচণ্ড ভীড়। অজস্র ঠাকুর এসেছে আর অধিকাংশই ঘাটের ধারেই বিসর্জন দিচ্ছে। প্রতিমা গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলতেই কয়েকটা আদুল গা ছেলে জলে নেমে প্রতিমা গুলো তুলে নিচ্ছে। ওরা পালেদের লোক, ফ্রেমগুল নতুন ঠাকুর গড়তে লাগবে। এতে খরচ অনেক কম পড়ে।
সুবীরদের নৌকা ভাড়া করা ছিল। ওরা ঠিক করল ভীড় কমলে নৌকা করে মাঝ গঙ্গায় গিয়ে ঠাকুর বিসর্জন দেবে। অন্য ছেলেদের জিম্মায় ঠাকুর রেখে ব্রতীন আর সুবীর ঘুরতে বেরোল। ছেলেগুলো সব পালা করে হোটেলে গিয়ে রাতের খাওয়ার খেয়ে নিল। ভীড় হাল্কা হতে হতে রাত প্রায় একটা হয়ে গেল। ভীষণ শীত করছে। ব্রতীন ভাবল একটা সোয়েটার আনলে ভালো হত, বড্ড ভুল করে ফেলেছে।
ভীড় সম্পূর্ণ কমে গেছে। কয়েকটা মাত্র নৌকা ঠাকুর নিয়ে ভেসে চলেছে। ওরা মাঝ গঙ্গায় ঠাকুর বিসর্জন দিল। ব্রতীনের মাথায় হঠাত্ খেয়াল চাপল। সে বলে বসল, “তোমরা ফিরে যাও, আমি সালকিয়ার দিক থেকে একটু ঘুরে আসি। এই ঠাণ্ডা জলে সাঁতার কাটতে সবাই বারণ করল কিন্তু ব্রতীন নাছোড়। অবশেষে সুবীরের কথায় সবাই মত দিল। সুবীর বলল, “বেশী দেরি কোরনা কিন্তু, আমরা তোমার জন্য পাড়ে অপেক্ষা করছি।”
ব্রতীন সার্ট প্যান্ট ছেড়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল আর দ্রুত সাঁতার কেটে চলল। কি ঠাণ্ডা জল, ব্রতীন আরো দ্রুত সাঁতার কাটতে লাগল। কিন্তু এ কি, তার হাত পা সব অসাড় হয়ে আসছে কেন! ব্রতীন অনুভব করল জলের অতলস্পর্শী গভীরতা। মনে হল নিকষ কালো অন্ধকার যেন সম্মোহনী শক্তিতে তাকে এক অতল গহ্বরের দিকে আকর্ষণ করছে। দূরে সালকিয়া ঘাটের আলোর বিন্দু গুলো কেমন মায়াজাল ছড়াচ্ছে। ব্রতীন বুঝতে পারছেনা সে কোথায় ভেসে চলেছে। তার সব শক্তি ফুরিয়ে আসছে। সে চিত্ সাঁতার কাটতে শুরু করল। অন্তত ভেসে থাকাত যাবে। শুক্ল সপ্তমীর চাঁদ মেঘে ঢাকা পড়েছে। উপরে নিকষ কালো অন্ধকার আর নিচে অতলান্ত গভীরতা। চারিদিকে কারা যেন নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে। আড় চোখে চেয়ে দেখল একদল কুমীর (গঙ্গা দেবীর বাহন মকর) দন্ত বিকশিত করে মহা উল্লাসে তার দিকে ধেয়ে আসছে। ব্রতীন আতঙ্কে চিত্কার করে উঠল, “মা গঙ্গা আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে বাঁচাও।”
হঠাত্ চারিদিক আলোয় আলোময় হয়ে উঠল। পুষ্পশোভিত স্বর্ণ রথে চড়ে আবির্ভূতা হলেন অপরূপা সুন্দরী এক নারী। বললেন, “ভয় পেওনা বত্স। তোমার আকুল প্রার্থনা আমি শুনেছি।”
গঙ্গা দেবী হাসলেন আর সে হাসি চতুর্দ্দিকে ছড়িয়ে দিল এক অনৈসর্গিক সঙ্গীতের অনুরণন। বললেন, “বত্স, অহংকার মহাপাপ। অহঙ্কারীকে শাস্তি পেতে হয়। আমি নিজেও বহুবার অহঙ্কারের জন্য শাস্তি পেয়েছি। শোন সে কাহিনী।
দেবর্ষি নারদের বিকৃত স্বর সাধনায় সব রাগ-রাগিণী মুমূর্ষু হয়ে পড়ল। তারা দরবার করল ভগবান বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণু তাদের নিয়ে কৈলাসে মহাদেবের কাছে উপস্থিত হলেন। বিষ্ণুর অনুরোধে রাগ-রাগি্ণীদের উজ্জীবিত করতে মহাদেব সংগীত শুরু করলেন। সেই সুরলহরী ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র বিশ্বে। সারা জগত্ উদ্বেল হয়ে উঠল আনন্দে। গাছে গাছে ফুটে উঠল ফুল, পাখির কলরবে দিকদিগন্ত মুখরিত হয়ে উঠল, মানব সমাজে নেমে এল সুখ-সম্মৃদ্ধি। সুরের আবেশে বিহ্বল বিষ্ণুর পদযুগল থেকে এক বিপুল জলরাশি রূপে জন্ম হল আমার। সেই বিপুল জলরাশির আঘাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে ব্রহ্মা তাঁর মন্ত্রপূত কমণ্ডলুতে আমাকে আবদ্ধ করলেন।
এদিকে মহা পূণ্যবান সগর রাজা শুরু করেছেন অশ্বমেধ যজ্ঞ। যজ্ঞের ঘোড়া নিয়ে ষাট হাজার রাজপুত্র বেরিয়েছেন বিশ্ব ভ্রমণে। ঘোড়া ফিরে এলে তাকে যজ্ঞস্থলে বলী দেওয়া হবে। প্রমাদ গণলেন কূটবুদ্ধি দেবরাজ ইন্দ্র। যজ্ঞ সুসম্পন্ন হলে সগর মহা পরাক্রমশালী হয়ে পড়বেন। এদিকে নানান অপকর্মের জন্য শিব ও বিষ্ণু ইন্দ্রের প্রতি অসন্তুষ্ট। তাঁকে সরিয়ে সগরকে স্বর্গের সিংহাসনে বসিয়ে না দেন। যে করেই হোক পণ্ড করতে হবে সগরের যজ্ঞ। খলবুদ্ধি ইন্দ্র যজ্ঞের ঘোড়া চুরি করে সমুদ্রতটে মহাজ্ঞানী বিষ্ণুর অবতার কপিল মুনির আশ্রমে তাঁর ধ্যানস্থলের কাছে বেঁধে রাখলেন।
হারান ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে সগর পুত্ররা এসে পৌঁছলেন কপিলের আশ্রমে আর ধ্যানমগ্ন মুনির সামনে ঘোড়া বাঁধা দেখে তাঁরা সমস্বরে চিত্কার করে উঠলেন, “মুনি ঘোড়া চোর, তাকে শাস্তি পেতে হবে।”
সেই ভয়ঙ্কর শব্দে মুনির ধ্যান ভঙ্গ হল আর ক্রুদ্ধ মুনির দুচোখ থেকে নির্গত অগ্নিশিখায় ভষ্মীভূত হলেন সগরের ষাট হাজার পুত্র আর তাঁদের আত্মা বন্দী হল ভষ্মরাশির মাঝে।
সগরের বংশধরেরা বহু প্রচেষ্টা করেও আবদ্ধ আত্মাদের মুক্ত করতে পারলেননা। অবশেষে রাজবংশ পুরুষশূন্য হয়ে পড়ল। এক মুনির পরামর্শে দুই রাণী সংগমে মিলিত হলেন এবং জন্ম হল ভগীরথের [ভগ শব্দের অর্থ নারীর যোনি; পুরুষের সংগম ছাড়া শুধু যোনি থেকে জন্ম বলে নাম হল ভগীরথ]। পুরুষের ঔরসের অভাবে তাঁর দেহ হল অস্থিহীন। একদিন মহা পরাক্রমশালী বিকৃতদেহ অষ্টাবক্র মুনি ভগীরথকে দেখে ভাবলেন তিনি তাঁকে অনুকরণ করে ব্যঙ্গ করছেন। তিনি ভযঙ্কর ক্রুদ্ধ হলেন। কিন্তু অবশেষে যখন বুঝতে পারলেন ভগীরথ সত্যিই বিকলাঙ্গ তখন তাঁর রাগ প্রশমিত হল এবং তিনি ভগীরথকে আশীর্ব্বাদ করলেন। তাঁর আশীর্ব্বাদে ভগীরথ স্বাভাবিক দেহ পেলেন। মুনি জানালেন যে ভগীরথ যদি ব্রহ্মার তপস্যা করে আমাকে মুক্ত করে পৃথিবীতে আনতে পারেন তাহলে আমার স্পর্শে তাঁর পূর্বপুরুষদের অভিশপ্ত আত্মারা মুক্তি পাবে।
ব্রহ্মলোকে গিয়ে কঠোর তপস্যা করে ভগীরথ ব্রহ্মাকে রাজি করালেন আমাকে মুক্তি দিতে। কিন্তু আমার ভারেযে স্বর্গ-মর্ত-পাতাল বিধ্বস্ত হবে। কে ধারণ করবে আমার মহাভার? এগিয়ে এলেন বাঘছাল পরিহিত জটাজুট ধারী এক তপস্বী। তাঁকে দেখেত আমি হেসে বাঁচিনা। এই সামান্য তপস্বী ধারণ করবেন আমাকে! ভাবলাম তাঁকে নাকানি চুবানি খাইয়ে একটু মজা করি। গর্বে মদমত্ত হয়ে অট্ট হাস্য করতে করতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম তাঁর উপর। কিন্তু এ কি! মুহূর্তে সমস্ত জগত্ তাঁর জটাজালে আবৃত হল। গভীর অন্ধকারে আমি তাঁর জটাজালে আবদ্ধ হলাম। গম্ভীর কণ্ঠে সেই পুরুষ বললেন, “আমি দেবাদিদেব মহাদেব। গঙ্গে, তোমার বড় অহঙ্কার। আমি তোমাকে শাস্তি দিলাম।”
আমি কাতর হয়ে বললাম, “আমাকে ক্ষমা করুন প্রভু। আমাকে যে অভিশপ্ত আত্মাদের মুক্ত করতে হবে।”
মহাদেব রূঢ় কন্ঠে বললেন, “অহংকার করার সময় একথা মনে ছিলনা? থাকো অনন্তকাল আমার জটায় বন্দী হয়ে।“
বিপন্ন ভগীরথ শুরু করলেন শিব বন্দনা। অবশেষে মহাদেবের মন গলল। আমি মুক্তি পেয়ে তিন ধারায় প্রবাহিত হলাম – স্বর্গে মন্দাকিনী, পাতালে ভোগবতী আর মর্তে অলকানন্দা। আমার মর্তের ধারাকে শঙ্খনাদে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন মহামতি ভগীরথ।
আমার স্পর্শে মর্তলোক আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠল। বন-বনানী পুষ্পে শোভিত হল, পাখির কলরবে চতুর্দিক মুখরিত হল, মরুভূমি হয়ে উঠল শস্য শ্যামলা, মানুষেরা পূজা-আরতি-উলুধ্বনি-শঙ্খরব আর সংগীতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলল। শিবের নির্দ্দেশ ভুলে আমি আবার গর্বে মদমত্ত হয়ে উঠলাম।
পথ চলতে চলতে ভগীরথ বক্র পথ নেওয়ায় আমি প্রশ্ন করলাম তিনি কেন ঘুর পথে চলেছেন। বিনয়ে বিগলিত হয়ে রাজপুত্র বললেন যে সামনে এক মুনির আশ্রম। সোজা পথে গেলে আশ্রমের ক্ষতি হবে। আমি গর্বভরে বললাম, “হোক ক্ষতি, আপনি সোজা পথেই চলুন।”
অগত্যা অনিচ্ছা সত্বেও ভগীরথ সোজা পথে চলতে থাকলেন আর আমি মহা উল্লাসে মুনির আশ্রম আর মুনিকে ভাসিয়ে দিলাম। ধ্যানভঙ্গ হল মুনির আর নিমেষে তিনি এক গগনচূম্বি রূপ ধারণ করে এক চুমুকে আমাকে শুষে নিলেন আর আমি আবার বন্দী হলাম।
আবার শুরু হল ভগীরথের প্রার্থনা এবং অবশেষে মুনি তার জানু ছেদন করে আমাকে মুক্তি দিলেন। সেই থেকে আমার আর এক নাম হল জাহ্নবী। আবার শুরু হল আমাদের পথ চলা।
পথ চলতে চলতে আবার আমার মন অহংকারে কলুষিত হল। দেবর্ষি নারদ এসে বিষ্ণুর সাবধান বাণী শুনিয়ে গেলেন কিন্তু আমি তা গ্রাহ্য করলামনা। তারপর একদিন ভগীরথ পথের দিশা হারালেন। বিপন্ন হয়ে শুরু করলেন বিষ্ণুর প্রার্থনা। আবির্ভূত হলেন শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধারী জগতের পালক ভগবান বিষ্ণু। সে অপরূপ মুর্তি দেখে আমার জীবন ধন্য হল।
বিষ্ণু বললেন, “গঙ্গে, এখন থেকে তোমার রাজসিক আর তামসিক সত্ত্বা এই নুতন পথে প্রবাহিত হবে আর তোমার সাত্ত্বিক সত্ত্বা মূল ধারায় প্রবাহিত হয়ে কপিল মুনির আশ্রমে পৌঁছবে।”
তারপর ভগিরথকে বললেন, “তুমি এই নদীপথ অনুসরণ করে পিছুপানে ফিরে যাও। পথের দিশা আবার খুঁজে পাবে আর সেই পথে গঙ্গার সাত্ত্বিক ধারাকে নিয়ে মুনির আশ্রমে পৌঁছবে।”
ভগীরথ ফিরে গিয়ে আমার সাত্ত্বিক ধারাকে নিয়ে মুনির আশ্রমে পৌঁছলেন আর আমার স্পর্শে মুক্তি পেলেন তাঁর পুর্বপুরুষদের আত্মারা। ভগীরথের নাম থেকে আমার সাত্ত্বিক ধারার নাম হল ভাগীরথী আর পুবের রাজসিক-তামসিক ধারার নাম হল পদ্মা। কৈলাশে মহাদেবের পদধৌত ব্রহ্মপুত্র মিশল পদ্মায় আর ভারতবর্ষের উত্তরাপথের সব প্রবাহ এসে মিশল আমার দুই ধারায়। আমার দুই ধারা সৃষ্টি করেছে সুন্দরবন ব-দ্বীপের। সেখানকার কাহিনী তুমি পরে জানতে পারবে।
জীবনে আর কখনো গর্ব করবেনা।”
একথা বলেই গঙ্গা দেবী অন্তর্হি্তা হলেন।
এদিকে অনেকক্ষণ ব্রতীন না ফেরায় সুবীর আর ক্লাবের ছেলেরা উত্কণ্ঠিত হয়ে পড়ল। ব্রতীনের খোঁজে অসংখ্য নৌকা নেমে পড়ল গঙ্গায়। কিন্তু কোথায় ব্রতীন? উত্কণ্ঠিত হয়ে থানার ও.সি. ফোন করলেন পোর্ট কমিশনারের অফিসে। অবশেষে ওদের স্পিড-বোট ভোরের দিকে ব্রতীনকে আবিষ্কার করল বজবজের কাছে। সে তখন গঙ্গাবক্ষে চিত্ হয়ে শুয়ে দুহাত জোড় করে সুবীরের কাছ থেকে শেখা গঙ্গা স্তোত্র আবৃত্তি করে চলেছে।
বিশ্বের মহানতম নদী গঙ্গা। ভারতীয় সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এই মহান নদী দেবীসদৃশা। আসুন আমরা এই মহান নদীকে কলুষ মুক্ত রাখি আর ব্রতীনের সাথে কণ্ঠ মেলাইঃ
“দেবি সুরেশ্বরী ভগবতী গঙ্গে, ত্রিভূবনতারিণি তরলতরঙ্গে।
শঙ্করমৌলিনিবাসিনি বিমলে, মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে।।”
মহানন্দা ব্রীজ পেরিয়ে হিলকার্ট রোড ধরে শিলিগুড়ি নর্থ স্টেশনের দিকে কিছুটা এগিয়ে রিক্সা ছেড়ে দিলাম। এবার হাঁটতে হবে। উত্তরের আকাশ মেঘ শুন্য। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় কাঞ্চন জংঘার চূড়োগুলো ঝিকমিক করছে। তেনজিং নোরগে বাস স্ট্যান্ডের পাশের বট্ল পামের সারির ফাঁক দিয়ে পড়ন্ত সূর্যটা উঁকি ঝুঁকি মারছে আর হাওয়ায় দোদুল্যমান পামের পাতার সাথে লুকোচুরি খেলা জুড়েছে। রাস্তার বাঁ-ধার জুড়ে অসংখ্য ছোটবড় জামা কাপড়ের দোকান। একটা সুঁড়ি রাস্তা এঁকে বেঁকে ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। সমীরদের বাড়ি যেতে হলে আমাকে এই রাস্তাটা ধরেই যেতে হবে।
ও-হো, আমি কে আর সমীরই বা কে তাতো বলা হয়নি। বিখ্যাত টি-ম্যাগনেট মৃগাঙ্ক চৌধুরীর নাম নিশ্চই শুনেছেন। আমি তাঁর একমাত্র সন্তান শৌভিক। শিলিগুড়ি ইস্টার্ন বাইপাসের কাছের একটা বিখ্যাত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। আমার মাকেও নিশ্চই চিনবেন। বিখ্যাত সমাজ সেবিকা নন্দিতা চৌধুরী। জলপাই মোড়ের কাছে বর্ধমান রোডের ঠিক পাশেই বিঘা খানেক জায়গা জুড়ে প্রাসাদের মত যে বিশাল বাড়িটা, সামনের বাগানে দেশি বিদেশি গাছপালা আর ফুলের সমারোহ, মাঝে একটা মার্বেলের পরীর মূর্তির চারপাশে ফোয়ারা – ওটাই আমাদের বাড়ি। বাড়িতে অসংখ্য চাকর-বাকর আর মালি রয়েছে। তবে আমার কোনো প্রাইভেট শিক্ষক নেই। শুনে হয়ত অবাক হচ্ছেন, কিন্তু কথাটা সত্যি। ক্লাশের পড়া শোনার পর আমি নিজেই সব পড়া তৈরি করে নিতে পারি। স্কুলের শিক্ষকরা বলেন, আমার মত ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র নাকি আগে এ স্কুলে আর কেউ আসেনি। পড়াশুনা ছাড়াও আরো কিছু কারণে আমি বাবার পরিচয় ছাড়াই নিজের পরিচয় দিতে পারি। সর্ব ভারতীয় কুইজ, ডিবেট, আবৃত্তি, ছবি আঁকা ও রচনা প্রতিযোগিতার দৌলতে আমার বেশ নাম হয়ে গেছে। কয়েকটা টেলিভিশন চ্যানেল থেকে আমার ইন্টারভিউও নিয়েছে, আপনারা অনেকে দেখে থাকতে পারেন। নাঃ, নিজের সম্বন্ধে এত বশি বলা ঠিক না।
ছোট বেলা থেকেই আমি আদর যত্ন আর প্রাচুর্যের মধ্যে মানুষ হয়েছি। আমার যে কত জামা-কাপড়, জুতো আর খেলনা রয়েছে আমি নিজেও তা জানিনা। বাবা-মা নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকলেও আমার সুখ স্বাচ্ছন্দের দিকে নজর রাখতে কখনো ভোলেননা।
নিজের কথাত অনেক বললাম। এবার সমীরের কথায় আসা যাক। সমীরের সাথে কি করে পরিচয় হল সেটা আগে বলে নি। কয়েক বছর আগের ঘটনা। আমি তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। শক্তিগড়ের কাছে মহানন্দার চরে একটা বিরাট মেলা বসেছিল। স্কুলের বন্ধুদের সাথে মেলা দেখতে গিয়েছিলাম। একটা মাউথ অরগানের দোকানের সামনে দোকানদার একটা সুন্দর বিদেশি মাউথ অরগান বাজাচ্ছিল আর সহকারি ছেলেটা ক্রমাগত হেঁকে চলেছিল, ‘মাত্র একশ টাকায় দামী চাইনিজ মাউথ অরগান’। হঠাত বাজনা থামিয়ে লোকটা চিতকার করে উঠল, ‘মারব এক চড়’।
লোকটার চিতকার শুনে সবাই লোকটার দিকে ফিরে তাকালাম। দেখি নোংরা আধছেঁড়া জামা পরা প্রায় আমার বয়সী একটা ছেলেকে উদ্দেশ্য করে লোকটা কথাটা বলেছে। ছেলেটার কাঁদোকাঁদো করুণ মুখ দেখে আমার বড় মায়া হল। আমি এগিয়ে গিয়ে ধমকে উঠলাম, ‘ওকে শুধু শুধু মারবেন কেন?’ আমার কথা বলার ধরন আর দামী পোশাক পরা এতগুলো ছেলেকে দেখে লোকটা ভড়কে গেল। কাঁচুমাঁচু হয়ে বলল, ‘দেখোতো ভিখিরির ছেলের কি আস্পর্দা। বলে কিনা, আমাকে ওটা একটু বাজাতে দেবেন?’
আমি রোগা ছেলেটাকে বললাম, ‘তুমি মাউথ অরগান বাজাতে পার?’
ছেলেটা আগ্রহের সংগে উত্তর দিল, ‘একটু একটু শিখেছি। আমার একটা সস্তা দামের আছে। এটা অনেক ভালো’।
আমি বললাম, ‘তুমি এটা বাজাতে পারবে?’
ছেলেটা একটু সাহস পেয়ে সপ্রতিভ ভাবে বলল, ‘কেন পারবনা?’
আমি একশ টাকা বের করে দোকানিকে বললাম, ‘একটা মাউথ অরগান দিন’।
দোকানি একটা মাউথ অরগান দিয়ে বলল, ‘একটু দেখে নাও’।
আমি ছেলেটার হাতে ওটা দিয়ে বললাম, ‘বাজাওতো’।
ছেলেটা একটা হিন্দি সিনেমার গান সঠিক সুরে বাজাতে লাগল।
আমি বললাম, ‘তোমার নাম কি?’
‘সমীর দাস। নর্থ স্টেশনের কাছে মহানন্দা বস্তিতে আমাদের বাড়ি’।
‘তুমি এটা নাও’।
‘ঠাট্টা করছেন নাতো?’
‘ঠাট্টা করব কেন?’
ছেলেটার চোখ আনন্দে ঝিক মিক করে উঠল। আমি এক বন্ধুর ডায়রির পাতা ছিঁড়ে আমার নাম, ঠিকানা আর মোবাইল নম্বর লিখে দিয়ে বললাম, ‘কোথা থেকে এটা পেয়েছ কেউ জানতে চেলে আমাকে ফোন করতে বলবে। না হলে ভাবতে পারে তুমি এটা চুরি করেছ’।
ছেলেটা কাগজটা পকেটে পুরে ছুটতে ছুটতে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। আমি ওর কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম।
মাস কয়েক আগে পাড়ার একটা চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছি, হঠাত ‘বাবু’ ডাক শুনে থমকে দাঁড়ালাল।চায়ের দোকান থেকে আমার বয়সি একটা আদুল গা ছেলে বেরিয়ে এসে বলল, ‘আমাকে চিনতে পারছেন?’
‘তুমি কে বলতো?’
‘আমি সমীর। মেলা থেকে আপনি আমাকে মাউথ অরগান কিনে দিয়েছিলেন। এখনো আমি রোজ্ ওটা বাজাই।‘
আমার এবার সব কথা মনে পড়ে গেল। বললাম, ‘এখানে কি করছ?’
‘গত মাস থেকে এই চায়ের দোকানে চাকরের কাজ পেয়েছি’।
এর পর থেকে প্রায় রোজই ওর সাথে দেখা হত। ওর বাবা মা দুজনেই একোটা দোকানে বিড়ি বাঁধার কাজ করেন। নর্থ স্টেশনের কাছে একটা জবরদখল বস্তিতে ওরা থাকে। ধীরে ধীরে সমীরের সাথে আমার বন্ধুত্ব জমে উঠল।
বেশ কয়েকদিন ধরে সমীর কে চায়ের দোকানে না দেখে দোকানীকে ওর কাথা জিজ্ঞাসা করলাম। দোকানী বলল, ‘কয়েকদিন আগে একটা সাইকেলের ধাক্কায় ওর পায়ে চোট লেগেছে। সারতে মাসখানেক লাগবে। সব কিছু একা সামলে ওর বাড়িতে যাওয়ার সময়ও পাচ্ছিনা’।
দোকানদারের কাছ থেকে সমীরদের বাড়ি কিকরে যেতে হবে ভালো করে জেনে নিলাম। পরের রবিবার স্কুল ছুটি। মা-বাবাও দুপুরে বেরিয়ে যাবেন ও একটা পার্টি সেরে রাত করে ফিরবেন। সমীরের সাথে দেখা করার এই সুযোগ। রবিবার মা-বাবা বেরিয়ে গেলে একটা রিক্সা নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে রিক্সা ছেড়ে দিয়ে পায়ে হাঁটা সুঁড়ি পথ ধরে নিচে নেমে চললাম। দোকানগুলো পার হয়ে কাঞ্চনভিউ হোটেলের পেছন দিয়ে পথটা সোজা মহানন্দার দিকে চলে গেছে। কিছুটা এগিয়ে নির্দিষ্ট মুদির দোকানটা দেখতে পেলাম। পেছনেই গায়ে গায়ে ঠেস দেওয়া একরাশ টালির চালের বাড়ি। আমাকে দেখে কয়েকটা নোংরা জামা পরা ছোট ছেলেমেয়ে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। সমীরের কথা বলতেই একটা ছেলে সপ্রতিভ ভাবে বলল, ‘আমার সাথে আসুন। সমীরদারতো পা ভেঙ্গে গেছে’।
‘সব জানি আর সেজন্যেইতো ওর সাথে দেখা করতে এসেছি’।
ছেলেটা নাচতে নাচতে অলি গলি আবর্জনার স্তুপ, বাড়ির উঠোন আর ছোটছোট ড্রেন পেরিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলল আর আমি প্রায় ছুটতে ছুটতে ওকে অনুসরণ করে চললাম। একটা বাড়ির সামনে এসে ‘এটাই সমীরদাদের বাড়ি’ বলে ছেলেটা ছুটে চলে গেল।
বাঁশের ছোট্ট বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গায় দুটো টালির চালের ঘর, বাঁশের বেড়ার দেয়াল, উঁচু করা মাটির মেঝে। বাঁশের দরজা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে কি করব ভাবছি, এমন সময় আমাকে দেখে সমীরের মা এগিয়ে এলেন, ‘তুমি নিশ্চই শৌভিক। সমুর কাছে তোমার কথা অনেক শুনেছি। আমাদের কি সৌভাগ্য তুমি এই বস্তি বাড়িতে এসেছ’।
পরনে লাল পেড়ে সস্তা শাড়ি, রোগাটে শরীর, প্রায় চুপসে যাওয়া মুখে অদ্ভুত স্নেহ মাখানো হাসি। আমার মনটা কেন যেন অজানা খুশিতে ভরপুর হয়ে উঠল। মনে হল ইনি যেন আমার কত দিনের চেনা।
আমাদের কথা শুনে সমীরের বাবা বেরিয়ে এলেন আর ঘরের ভেতর থেকে সমীর আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, ‘শৌভিক তুমি এসেছ!’
আমি চটি ছেড়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
ঘরের মাটির মেঝে গোবর দিয়ে লেপা, দেয়ালে কয়েকটা দেবদেবীর ছবি। সমির একটা খাটিয়ায় কাত হয়ে শুয়ে আছে। বাঁ পায়ের নিচের দিকটা প্লাস্টার করা। আমাকে কোথায় বসতে দেবেন তাই নিয়ে ওর মা-বাবা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি একটুও দ্বিধা না করে সোজা সমীরের বিছানার কোণে বসে পড়লাম। সমীর খুশিতে নির্বাক ডগমগ হয়ে পড়েছে, মুখে কোনো কথা সরছেনা। আমিই কথা শুরু করলাম। বললাম, ‘কি করে এটা হল?’
‘তাড়াতাড়ি রাস্তা পার হতে যাচ্ছিলাম, একটা সাইকেল পেছন থেকে ধাক্কা মারে। শক্ত রাস্তায় পড়ে গিয়ে গোড়ালির হাড়ে চিড় ধরেছে। পনেরো দিন হয়ে গেল। প্লাস্টার খুলবে আরো সাতদিন পর। সম্পূর্ণ সেরে উঠতে কত সময় লাগবে কে জানে’।
‘কোনো চিন্তা করিসনা ঠিক সেরে উঠবি’।
‘মালিক খুব ভালো। আমি কাজে না গেলেও মাইনে কাটবেনা। তাছাড়া চিকিতসার জন্য কিছু টাকাও পাঠিয়েছে’।
সমীরের বাবা আমার জন্য মিষ্টি আনতে যাচ্ছিলেন। য়ামি বারণ করলাম। ওর মাকে বললাম,
‘বাড়িতে মুড়ি পেঁয়াজ, লংকা থাকলে ভালো করে মেখে দিন। আমি মুড়ি মাখা খেতে খুব ভালো বাসি’।
সমীরের মা খুশি হয়ে মুড়ি মাখতে রান্না ঘরে চলে গেলেন।
মুড়ি খেতে খেতে সমীরের সাথে অনেক গল্প করলাম। মনে হল যেন অমৃত খাচ্ছি।
সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। স্কুলের কিছু টাস্ক সেরে রাখতে হবে। ওদের বিদায় জানালাম। সমীর আর ওর মা-বাবা বললেন ‘আবার এস’।
‘নিশ্চই’।
কথাটা আমি মন থেকেই বললাম। আমি জানি আমাকে বার বার এখানে আসতে হবে, সমীর সেরে ওঠার পরও।
সঙ্গে একহাজার টাকা এনেছিলাম। অনেক দ্বিধা করার পর ওর মায়ের হাতে টাকাটা দিয়ে মিথ্যা করে বললাম, ‘টাকাটা মা পাঠিয়ে দিয়েছেন’।
সমীরের মা-বাবা আপত্তি জানাতে বললাম, ‘টাকাটা ফেরত নিয়ে গেলে মা খুব রাগ করবেন’।
সমীরের মা টাকাটা নিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে বললেন, ‘তোমার মা দেবীতুল্য। লোকে বলে গরীব লোকদের উপর উনার খুব দয়ামায়া’। আমার মুখে নিজের অজান্তে একটু হাসি খেলে গেল।
এখনো সন্ধ্যা হতে কিছুটা বাকি আছে। ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মহানন্দার পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। নদীটা এখানে দুভাগ হয়ে গেছে। মাঝখানে একটা বিরাট চড়া। নদীতে জল নেই বলতে গেলে। হেঁটে পার হলে হাওড়া পেট্রোল পাম্পের কাছে পৌঁছন যাবে। আমি নদীর প্রথম অংশটা পেরিয়ে চড়ার উপর এসে দাঁড়ালাম। সূর্যটা লাল হয়ে পশ্চিমে পামের পাতার আড়ালে হেলে পড়েছে। সামনে নদীর জলে রঙ্গিন আকাশের ছায়া পড়েছে। পাহাড়ের নিচের অংশ গভীর কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করেছে। উপরে কাঞ্চন জঙ্ঘার বড় চূড়াটায় এখনো শেষ সূর্যের আলো খেলা করছে। একটা মিষ্টি হাওয়ায় ঝোপড়া রুদ্রাক্ষ গাছটার পাতায় মৃদু দোল উঠছে। আমার মনটা এক অদ্ভূত খুশিতে ভরপুর হয়ে উঠছে। জীবনে আগে যা পাইনি তার অনাস্বাদিতপূর্ব স্বাদ আজ পেলাম।
মনে হল আমি যদি সমীরের মত হতাম, যদি কোনো উপহার আর প্রাচুর্য না থেকেও ওর মত অনেক বড় কিছু পেতাম।
###
লেখক পরিচিতি

গল্পগ্রন্থের লেখক রতন লাল বসু অর্থনীতিতে ডক্টরেট এবং পেশাগত ভাবে অর্থনীতিবিদ। পেশার বাইরে তাঁর নেশা হল সাহিত্য ও রবীন্দ্র সংগীত। তাঁর সাথে যোগাযোগের ঠিকানা rlbasu@rediffmail.com